ডাকিণী (শেষ পর্ব)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
আগুনটা দ্রুত সারাটা কটেজে ছড়িয়ে পড়লো। সাঞ্জে, আর মনিকার দেহ অধিকারিণী আলেস তখন সুখ নিদ্রায় ব্যাস্ত। গতরাতটা অসাধারণ কেটেছে তাদের। হয়তো ১২০০ বছর আগে মার্টিনীর সাথে এমনি কোন এক রাতের কথা আলেস তার ডায়ারীতে লিখেছিলো। ক্রমশ ধোয়া ঘনিয়ে আসছে। কাশতে কাশতে হঠাৎ সাঞ্জের ঘুম ভেঙ্গে গেল। ততক্ষণে আগুন বেডরুমের সামনের দরজাকে গ্রাস করে নিয়েছিলো। সে দ্রুত ঘুমকাতুরে আলেসকে জাগালো। জ্বলন্ত মৃত্যুর সামনে হতভম্ব ওরা দুজন স্থির দাড়িয়ে রইলো।
বিশাল কটেজটার চারপাশে জনবসতি খুবই কম। তার উপর কটেজটা ২০ ফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা। যতক্ষণে প্রতিবেশীরা দেয়ালের উপর দিয়ে ধোয়ার কুণ্ডলী দেখে দমকলে ফোন দিলো, ততক্ষণেই কটেজটার পুরোটাই জ্বলে শেষ। তাই দমকল বাহিনীকে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। ওরা যখন বেডরুমে ঢুকলো তখন দরজার সামনেই মনিকার পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া দেহটা পেয়ে গেল। আলেস ততক্ষণে দ্বিতীয় মৃত্যুর স্বাদ নিয়ে দেহটা ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। সাঞ্জেকে পাওয়া গেল সেই আবদ্ধ বাথরুমে। ২৫ ভাগ পুড়ে যাওয়া দেহ নিয়ে সে তখনো বেঁচে ছিলো। ওকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। কটেজটার ইন্সুরেন্স করা ছিলো ভিগাতিয়ার কম্পানিতে। সাঞ্জেই করিয়েছিলো। সে কম্পানির দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ রবার্তো ট্রাভেজ পরদিন এলেন কটেজটা পরিদর্শন করতে। তিনি দমকল বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানতে পারলেন আগুনটা লেগেছিলো রান্নাঘরের স্টোভ থেকে। উনি নিজেও পরিক্ষা করে দেখলেন। দেখে মনে হল কেউ একজন স্টোভের গ্যাস ছেড়ে তাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাতেই কটেজটা পুড়ে ছাই। উনি মনে মনে খুশিই হলেন। উনার কম্পানিকে এই দুর্ঘটনার জন্যে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। ট্রাভেজ দ্বিগুন উৎসাহে কটেজের সবগুলি কক্ষে তল্লাসি চালালেন। উনি যখন বেডরুমে ঢুকলেন তখন ছাই হয়ে যাওয়া বিছানার উপর পুড়ে দুমড়ে যাওয়া একটা নেক্সাস ৭ পেলেন। ফোনটা একেবারেই ডেড হয়ে গেছে। তবে মেমরি স্টোরেজটা হয়তো এখনো ঠিক আছে। উনি ফোনটা উপস্থিত দমকল কর্মী ও পুলিশের অগোচরে আস্তে করে পকেটে ঢুকিয়ে নিলেন। সবাই যার যার মতো ব্যাস্ত থাকায় ব্যাপারটা কেউ খেয়াল করলো না। বাড়ি ফিরার পথে উনি সুপারমার্কেট থেকে আরেকটি নেক্সাস ফোন কিনলেন। বাড়ি ফিরে পুড়ে যাওয়া সাঞ্জের ফোনটা ভেঙ্গে তার ভেতর থেকে মেমরি স্টোরেজটা বের করে নিয়ে নতুন ফোনের মাদারবোর্ডে লাগিয়ে দিলেন। সুইচ টিপতেই নতুন ফোনটা চালু হয়ে গেল! তখন নিজেকে একজন ডাক্তারের চেয়ে কোন অংশে কম মনে হলো না তার। বিখ্যাত মোবাইল সার্জন ডাক্তার রবার্তো ট্রাভেজ। আপন মনেই খানিক ক্ষণ হাসলেন তিনি। অতপর তিনি যখন সাঞ্জের স্টোরেজ ঘাটছিলেন তখন একটা ফোল্ডারে তার চোখ আটকে যায়। ওটার নাম ছিলো “Virtual Diary”। ওতে একটা ওয়ার্ড ফাইল ছিলো। ওটা খুলতেই কতগুলি আজব লেখা বেরিয়ে পড়লো। ট্রাভেজ বাংলা জানেনা। কিন্তু প্রবাসী সাঞ্জে তার ডায়ারীর সম্পূর্ণটাই বাংলায় লিখেছে। উনি ফাইলটা ইমেইল করে ওয়ারশোতে একজন পরিচিত ভাষাতত্বের প্রফেসরের নিকট পাঠালেন। সাঞ্জের ভার্চুয়াল ডায়ারীর ইংরেজি অনুবাদটা সাত দিনের মাথায় ট্রাভেজের কাছে ইমেইলের মাধ্যমে ফেরত আসে। ট্রাভেজ এক নিঃশ্বাসে সবটাই পড়ে নিলেন! অবিশ্বাস্য! এও কি সত্যি হতে পারে? কিন্তু সত্যি না হলে কেন একজন নিজের ডায়ারীতে এসব লিখবে? তবুও ট্রাভেজের মনে হলো এসব কিছুর প্রকৃত ব্যাখ্যা এ ডায়ারীর মালিক সাঞ্জেই ভালো দিতে পারবে। উনি গাড়িটা নিয়ে তখনই রওনা দিলেন হসপিট্যালে সাঞ্জের সাথে দেখা করতে। কিন্তু সাঞ্জের শারিরিক অবস্থা ভালো না থাকায় ডাক্তার তাকে দেখা করতে দিলেন না। পরের সপ্তাহে তিনি আবার গেলেন। এবার উনি দেখা করার অনুমতি পেলেন। সাঞ্জের রুমে ঢুকে তিনি দেখলেন সে বিছানায় শুয়ে আছে। তার মা বাবা উৎকণ্ঠিত হয়ে তার পাশেই বসে আছেন। ট্রাভেজ তাদের কাছে সাঞ্জের সাথে একান্তে কথা বলার অনুমতি চাইলেন। উনারা ট্রাভেজকে সাঞ্জের রুমে রেখে বাহিরে চলে গেলেন।
এবার সে একটা চেয়ার টেনে সাঞ্জের মুখামুখি বসলো। সাঞ্জের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাস করলো “আপনি কি বলতে পারেন ওখানে কিভাবে আগুন লেগেছিলো।”
সাঞ্জে ভাবলেশহীন চেহারায় উত্তর দিলো “স্টোভ থেকে আমিই লাগিয়েছি।”
ট্রাভেজ প্রথমে বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে নীচু স্বরে বলল, “সাঞ্জে, আমি তোমার ভার্চুয়াল ডায়ারীটা পড়েছি। ওসব যা লিখেছো তার সবই কি সত্যি?”
প্রশ্ন শুনে সাঞ্জে অগ্নিমূর্তি ধারণ করল। হঠাৎ সে ট্রাভেজের গলা টিপে ধরে চিৎকার করে বললো “আমি সাঞ্জে নই, মনিকা। সাঞ্জে আর আলেস পরপারে চলে গেছে। বেঁচে আছি আমি, শুধুই আমি।”
সাঞ্জের চিৎকার শুনে ডাক্তার নার্স এসে ট্রাভেজকে ছাড়িয়ে নিলেন। কিন্তু হুড়োহুড়িতে সবার অলক্ষে ট্রাভেজের নেক্সাসটা সাঞ্জের বিছানায় পড়ে গেলো। সবাই ওকে একা রেখে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। এই সুযোগে সাঞ্জে নেক্সাসটা হাতে নিলো। ওর ভার্চুয়াল ডায়ারী ফোল্ডারটা বের করাই ছিলো। সাঞ্জে ওটাকে চিরতরে ফোন থেকে ডিলিট করে দিলো। পরক্ষণেই ঘুমের ইঞ্জেকশন নিয়ে রুমে এক সুঠামদেহী নার্স প্রবেশ করলো। সাঞ্জে লক্ষি মেয়ের মতো ইনজেকশনটা নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
ওদিকে ডাক্তার অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে ট্রাভেজকে সাঞ্জের মানসিক অবস্থা খুলে বললেন। ডাক্তারের মতে দুর্ঘটনার পরে সাঞ্জের মাল্টিপল আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার হয়েছে। এই মানসিক রোগের কারণে সাঞ্জে নিজেকে তার মৃত বন্ধু মনিকা ভেবে ভুল করছে।
কিন্তু সাঞ্জের ডায়ারীটা পড়া থাকায় সমস্ত ব্যাপারটা ট্রাভেজের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। মারগারেটের প্রেতাত্মার বশবর্তী হয়ে সাঞ্জে সেদিন মনিকা কে খুন করে। তারপর মনিকার লাশে মারগারেট প্রবেশ করলে সাঞ্জে তাকেও খুন করে। অতঃপর মারগারেটের কবল থেকে মুক্ত হয়ে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। খুনের দায় এড়াতে সে তখন আদিনের কালোজাদুর বইয়ের সহায়তায় আলেসের আত্মাকে মনিকার দেহে ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু মনিকার লাশটা বেশীক্ষণ রান্নাঘরে রেখে দেয়ার ফলে তার আত্মাটা সেখানেই আটকা পড়ে। ঠিক যেমন আলেসের আত্মাটা বেসমেন্ট, লাইব্রেরী বেডরুম আর কুয়োর ভেতর আটকে পড়েছিলো। আলেসের আত্মাটা যেমন মোমবাতি থেকে আদিনের ধর্মীয় বইয়ে আগুন লাগিয়েছিলো ঠিক তেমনি মনিকাও স্টোভ থেকে পুরো কটেজে আগুন লাগিয়ে দেয়। মনিকার দেহ জুড়ে থাকা আলেস সেই আগুনে পুড়ে মারা যায়। কিন্তু তোখড় উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন সাঞ্জে বাথরুমে ঢুকে নিজেকে আড়াল করে নেই। তবুও সে বাঁচতে পারে না। ধোয়ায় দম আটকে বাথরুমেই মারা যায়। খানিক পরে ধোয়া কমে এলে মনিকার আত্মা সাঞ্জের দেহে প্রবেশ করে। ডাক্তার এটাকে মাল্টিপল আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার ভেবে এখনো চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।
ট্রাভেজ ভাবে সত্যিই কি আলেস আর সাঞ্জে পরপারে চলে গেছে না কি এখনো কটেজে আটকে আছে? এটা জানার একটাই পথ আছে। ট্রাভেজকে সেই অভিশপ্ত কটেজে ফিরে যেতে হবে।
ট্রাভেজ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটায় ফুল আক্সেলারেশনে। গন্তব্য সেই অভিশপ্ত কটেজ। কিন্তু পথিমধ্যে এক মধ্যপ ড্রাইভার উল্টো লেনে এসে ঠিক ওর গাড়িটাতেই ধাক্কা মারে। ট্রাভেজের গাড়িটা উল্টে খাদে পড়ে যায়। খুব দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলেও, দুদিনের মাথায় সেও মারা যায়। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আলেস, মার্টিনী, সাঞ্জে আর প্রিস্টের সেই না জানা কাহিনীটা লোকচক্ষুর অগোচরে চলে যায়।
৮ বছর পর,,,,,,,
সাঞ্জের দেহে মনিকা খুব ভালভাবেই নিজেকে মানিয়ে নেয়। এরই মধ্যে সাঞ্জের বাগদত্তা অভির সাথে তার বিয়ে হয়েছে। তাদের দুটো বাচ্চাও বেড়ে উঠছে। মনিকা বহুগামিতা আর মদের নেশা ছেড়ে এক সুখি সংসার জীবন উপভোগ করতে থাকে। তবে দুর্ঘটনার পর সে কটেজটা বিক্রি করে দিয়েছিলো। এখন সেখানে একটা সুউচ্চ শপিংমল গড়ে উঠেছে। এক গৃষ্মে সাঞ্জের মা বাল্টিসে তার মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। দুদিন থাকার পর উনি দুই সামান্য কেনাকাটা করতে সেই শপিংমলে যান। দুই নাতির জন্যে কিছু খেলনা কেনার পর তিনি একটা জুয়েলারি দোকানে ঢুকেন। দোকানের শোকেসে একটা লাল পাথর বসানো আংটি দেখে তার পছন্দ হয়ে যায়। সামনেই তার মেয়ের জন্মদিন। জন্মদিনে এই সুন্দর রিংটা তার মেয়েকে উপহার দিবেন বলে ঠিক করেন। তিনি রিংটা নেড়ে চেড়ে হাতে পরে নিলেন। বাহ! সুন্দর ফিট হয়েছে তো। উনার মেয়ের আঙুলও ঠিক তারই মাপের। মেয়েটাকে দারুন মানাবে এতে। খুশি মনে আংটির মূল্য পরিশোধ করে উনি মলের তৃতীয় তলায় গেলেন নিজের জন্যে কিছু কাপড় কিনতে । আংটিটা তখনো তার হাতেই পড়া ছিলো। সেই দোকানে কয়েকটা গাউন পছন্দ করে সাইজ চেক করতে তিনি ট্রায়েলরুমে ঢুকেন। ট্রায়েলরুমের আয়নার দিকে চোখ পড়তেই তিনি চমকে উঠলেন। তার মেয়েটা নিষ্পলক চোখে আয়নার ভেতর থেকে তার দিকেই তাকিয়ে আছে!
(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.