করিডোর- পর্ব১-নুরুন নাহার লিলিয়ান।

হরর গল্প পর্ব১ – করিডোর:

মাস কয়েক হবে আমরা সরকারী বাসায় উঠেছি।ছিমছিম পাচঁ তলা বিল্ডিংয়ের তিন তলায় আমাদের ফ্লাট। আমার আবার সব জায়গাই ভাল লাগে। বিয়ের পর দেশে বিদেশে স্বামীর সাথে কতো বিচিত্র রকম জায়গায় বসবাস করেছি। চেষ্টা করেছি আশে পাশের মানুষ আর সব কিছুর সাথে মানিয়ে চলতে। তাই প্রথমে চেষ্টা থাকে বসবাসের জায়গাটাকে ভালোবাসা। সেটা যে রকমই হোক।বর ভদ্র লোক বাসায় কম থাকে। বেশির ভাগ সময় ল্যাবেই কাটিয়ে দেয়। বিয়ের আগে মজা করে বলেছিলেন আমার সাথে বিয়ে হলে আমি কিছু দিতে না পারলেও লেখার জন্য অনেক অভিজ্ঞতা আর উপকরন পাবেন।একজন লেখকের জন্য যা সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সত্যিই টের পেলাম বিয়ের দিন থেকেই। অনেক বৈচিত্র্যময় উন্থান পতনের ইতিহাস থাকে গবেষকদের জীবনে। শুনেছি এই বাসার আগের লোকের অফিশিয়াল কারনে অন্য কোথাও বদলি হয়েছে। এরপর দশ মাস কেউ ছিল না।
বাসাটায় আসার পর থেকে কিছু এলোমেলো বিষয় মস্তিষ্ক কে একবার হলেও নাড়া দিয়ে যায়। প্রায়ই বাসার অনেক জিনিস হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুজির পর ও পাওয়া যায় না। তারপর অনেক দিন পর দেখা যায় ঠিক আগের জায়গায় আছে। সেদিনও হাত ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সতের দিন পর সেই একই জাগায় পেলাম। মনেহয় অদৃশ্য ভাবে কেউ আমার সাথে খেলা করে। লুকোচুরি খেলা। আমাদের সবার মধ্যে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভীষন ভাবে কিছু সময়ে সচেতন থাকে। আমার ড্রয়িংরুম আর বেড রুম থেকে ভিতরের বেড রুমে যেতে একটা ছোট করিডোর আছে। মাঝে মাঝেই লাইট টা জ্বলে না। আবার নিজ থেকেই জ্বলে।ভাবি বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা। আসলে সমস্যা হয়তো অন্য কোথাও। ভর দুপুর কিংবা মধ্যরাতে নিস্তব্ধ বাসায় বুঝা যায় ভারী পর্দা গুলো যখন নড়তে থাকে। আমি গভীর ভাবে অনুভব করি কেউ হেটে যায়।ধীর পায়ে হেটে যায়।যে সব কিছু দেখছে। আমার স্বামী প্রায়ই বিরক্ত হয়ে বলে ছন্দা তোমার মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে.

আমাকে নিয়ে মশিউলের এমন খামখেয়ালি ভাবনা চরম বিরক্ত করে।আমি বিরক্ত হলেও আমার নিজস্ব সব ভাবনা তার কাছে প্রকাশ ও করিনা । সব কিছু বুঝার ক্ষমতা সবার নেই। প্রকৃতির রহস্যময়তা কিংবা ভয়ংকর ব্যাখ্যাহীন বিষয় গুলো বুঝতে হলে খুব স্পর্শকাতর হৃদয় থাকতে হয়।চিন্তা গুলো খুব সচেতন রাখতে হয়। বিজ্ঞান এবং ধর্ম সব সময়ই তাদের সমান্তরাল নীতিতে এক। কিন্ত তা অনুভব কি সবাই সমান্তরাল ভাবে করতে পারে? এই তো সেদিন সন্ধ্যে রাত। আমি ছোট খাটো শপিং করে দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকলাম। হঠাৎই ব্যাখ্যাহীন ভাবে আমার পুরো শরীর হীমশীতল হয়ে উঠলো। একটু ভয় ভয় আতংক আমার সমস্ত অস্তিত্বতে ছড়িয়ে গেল। মনে হচ্ছিল বরফ জমাট শরীরটা আমি নাড়াচাড়া করতে পারছিলাম না।

সপ্তাহে দুই তিন দিন নিয়ম করে আমরা বাইরে ডিনার করি। আর সেই সাথে বাসার প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করা। খুব সচেতনতা নিয়ে আমি সামনের ড্রয়িংরুম এবং বেড রুমটাকে কেয়ারফুলি দেখে নিলাম।হঠাৎ আমার ঢেকুর নামল।বুকের ভিতর আটকে থাকা খাবার গুলো পাকস্থলীতে পৌছালো। নিজের ভিতরের এমন বৈজ্ঞানিক ব্যাখাযোগ্য শব্দেও আমি আঁতকে উঠি। তারপর বুঝার জন্য কিছুটা সময় নিলাম। বাইরে বের হওয়ার সময় সব রুমের লাইট বন্ধ করলেও মাঝখানের করিডোরের লাইট শুধু অন করে বের হই।

সব সময় যে এমনটা হয় তা নয়।এই যান্ত্রিক ইট পাথরের ঢাকা শহরে আমাদের ক্যাম্পাসটা সবুজের সমারোহে নান্দনিক আবহাওয়া রাখে। তারপরও দরজা জানালা গ্রীলের ফাঁক ফোকর দিয়ে প্রবেশ করে ফ্লোরে ধুলার কার্পেট বিছায়। বেশ কিছুটা সময় আমি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। তবুও নিজের ভিতরের ধুক ধুক শব্দটা কে সুইচ অফ করতে চেষ্টা করলাম। এক গ্লাস পানি খেয়ে সোফায় শান্ত হয়ে বসলাম। তারপর অনুভব করলাম সবই হয়তো মনের ভুল। এই তথ্য প্রযুক্তি আর আলোঝলকানি যুগে সেই অন্ধকার ইতিহাস ভূত প্রেতের কথা ভাবা সত্যি হাস্যকর। তারপরও কেন এমন হয়। লোক লোকালয়ের এই নাগরিক জীবনে ভূত প্রেত বা অদৃশ্য অশরীরীর অস্তিত্ব টিকে থাকাও কঠিন।

আমি সব ভাবনা বাদ দিয়ে ফ্রেস হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। ড্রয়িংরুমের সাথে আমার বাসায় একটা কমন বেসিন আছে। টিভিটা অন করে আমি চোখে মুখে পানি দিতে গেলাম। কয়েক ঝাপটা মুখে পানি দেওয়ার পর বিষয়টা চোখে পড়ল। বেড রুম আর ড্রয়িংরুমের মাঝখানের পথ দিয়ে করিডোরের যে পথটা টয়লেটের দিকে গেছে সেখানে।হালকা ধুলাময় ফ্লোরে তিনটা বড় বড় অস্পষ্ট পায়ের ছাপ। আমার বুকের ভিতরটা কেমন মুচরে উঠলো……(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.