“অসম প্রেম” পর্ব১ -আয়েশা সুলতানা

 

“অসম প্রেম” পর্ব-১
——–আয়েশা সুলতানা

জেবা বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তার বান্ধবী প্রীতির জন্য। প্রায় আধঘণ্টার উপরে হয়ে গেসে। জেবার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে, মনে মনে ভাবছে “প্রীতিটার কোন কমনসেন্স নাই” কেউ এত দেরি করে? একা একা কতক্ষণ দাঁড়ানো যায়,, এই ভেবে জেবা বিলের উত্তরদিকে হাটতে শুরু করে, আর ভাবে ওদিকটায় মা কখনো যেতে দেয় না, সবসময় নিষেধ করে, কি আছে ওদিকে?
জেবার মা জোবায়দা খুবই সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে আর যথেষ্ট গুনীও বটে.. আর বাবা ও বা কম কিসে? ছোট একটা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করলেও বাবা খুবই ব্যক্তিত্ত্বসম্পন্ন মানুষ।
জেবার বাবা আশিকুর রহমান পেশায় মাদ্রাসা শিক্ষক হলেও তিনি এলাকায় খুবই সম্মানিত,, এলাকার যেকোন বিপদে আপদে সকলে তার কাছ থেকেই পরামর্শ নেয়,, জেবার বাবার সামান্য আয়ের ছোট সংসারে তার আরো ছোট দুই বোন জুই ও মনি, আর বড়ভাই রাশেদ, ছোট সুখী পরিবার… ভাবতে ভাবতে জেবা অনেক দূর চলে আসে, হঠাৎ কারো ডাক শুনতে পায় জেবা,,, থমকে দাঁড়ায়,, চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে সন্ধ্যা নেমে এসেছে,, জেবা ভয় পায়…. গাঁ ছমছম করে উঠে,,,,, অন্যরকম শিহরণ বেয়ে যায় জেবার সারা শরীরে…. আর এর মধ্যেই জেবা বুঝতে পারে বাম কাঁধে কারো শীতল স্পর্শ.

জেবা শিউরে উঠে………..
মনে মনে নিজেকে প্রচন্ড বিদ্রুপ করে এই ভেবে যে মায়ের নিষেধ শর্তেও কেন এলো এদিকটায়…

জেবা এই জেবা এখানে কেন এসেছিস, বারবার বলি এদিকে আসবি না, এত বড় হয়েছিস বোধবুদ্ধি কবে হবে তোর?? আরেকটু হলেই তো বাঁশের কোনাটা চোখে ঢুকতো, কি হতো তখন?? কড়া সুরের কথা গুলো শুনেই জেবা পিছনে ফিরে মাকে সজোড়ে জড়িয়ে ধরে ফোফাতে থাকে,,,,
জোবায়দা বুঝতে পারে যে জেবা খুব ভয় পেয়েছে, মৃদু কণ্ঠে এবার তিনি জেবাকে বললো চল..
জেবা দেখলো মায়ের সাথে প্রীতিও আছে।। তখন ও বুঝলো প্রীতি ওকে না পেয়ে বাড়িতে যায়, আর মা সহ ওকে খুজতে বের হয়…
জেবা বুঝতেই পারে না কেন এ জায়গার প্রতি ও এত টান অনুভব করে……
আর আজ তো আরেকটু হলে বাঁশঝাড়ের ভিতরই চলে যেতো…

জেবা যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিল তার থেকে আর মাত্র দু’কদম এগুলেই বিশাল বাঁশঝাড়,, ওটার পিছনে আবার ঘন জঙল,, গ্রামের এপাশে লোকালয় নেই বললেই চলে, শুনশান জায়গা, একটা পাতা পড়ার শব্দ ও খুব ভয়ঙ্কর হয়,,, এ যেন এক অন্য জগৎ….

গ্রামে অবশ্য বিভিন্ন কাহিনি ও প্রচলিত আছে এ বাঁশঝাড় নিয়ে,, যারাই জানতে চাইতো বাঁশঝাড়ের ওপাশে কি আছে তাদের সবার নাকি লাশ পাওয়া যেতো বাঁশে ঝুলন্ত অবস্থায়,,,,,,

তবে জেবার ১৮ বছর বয়সের মধ্যে ও কখনো দেখে নি এদিকে কাউকে আসতে…

আসার পথে জেবা মাকে জিজ্ঞাস করলো মা কেন নিষেধ করো??? কেন এদিকে আসা যাবে না??? প্লিজ মা বলো…..সবসময় এড়িয়ে যাও কেন এপ্রশ্নটা??? মা এ জায়গাটা কেন আমার এত ভাল লাগে? কেন আমি ওখান থেকে মনমুগ্ধ করা ফুলের সুগন্ধ পাই?? না জানি সে ফুল দেখতে কত সুন্দর……
মা বলো না প্লিজজজ…
এতক্ষন জোবায়দা চুপ করে হেটে চলেছে, এবার বললো কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি পা চালা… জেবা দেখলো ওরা বাড়ির পথ পেরিয়ে আরো সামনে চলে এসেছে, জানতে চাইলো ওরা কোথায় যাচ্ছে?? জোবায়দা কিছু বলল না, প্রায় ১কিলো হেটে ওরা এলো জেবার বাবার মাদ্রাসার কাছে।।।

আশিকুর রহমান স্ত্রী ও কন্যাকে দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন,,, তারপর স্ত্রীর কাছে বিস্তারিত শুনে তাড়াহুড়ো করে চলে যান মাদ্রাসার বড় হুজুরের কাছে….হুজুরকে বিস্তারিত খুলে বলেন…
তিনি সব শুনে একটু পানি ও কিছু খেজুর দিয়ে বলেন এগুলা শিখানো পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে,,,,,
এরপর তারা বাড়ি ফিরে এলো…

রাস্তায় থাকা অবস্থায়ই জেবার খুব শারিরিক অস্বস্তি লাগছিলো… কেমন যেন হাত পা ভেঙে আসছিলো…হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো….

বাড়ি পৌছে আর স্থির থাকতে পারলো না…উঠোনেই ধাম করে পড়ে গেলো…. জোবায়দা ওকে ধরে দেখলো যে ওর গায়ে প্রচন্ড জ্বর…..

জেবাকে ঘরে নিয়ে আসলো বাবা মা দুজন মিলে,আর জোবায়দা দেরি না করে তাড়াতাড়ি চুলায় পানি দিল, পানি গরম হলে বড় হুজুরের দেয়া পানি গরম পানিতে মিশিয়ে জেবাকে গোসল করিয়ে দিল।।

কিছুক্ষন পর জেবার হুশ ফিরলো,, মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো “মা কি হয়েছে? ”
জোবায়দা কিছু না বলে জেবাকে একটা খেজুর দিয়ে বললো এটা খেয়ে নে,, জেবা বুঝতে পারলো মায়ের মেজাজ ভাল না,, তাই কিছু না বলে চুপচাপ খেয়ে শুয়ে পড়লো……

সকালে অনেক বেলায় জেবার ঘুম ভাঙলো.. বিছানা থেকে উঠতে যাবে তখনই জেবা টের পেল তার সারা শরীর প্রচন্ড ব্যাথা…
ওর মনে হচ্ছিল যেন কেউ ওকে বেধড়ক মেরেছে।।খুব কষ্ট হচ্ছিল ওর উঠতে..জোবায়দা এসে ওকে ধরে বসালো,সাথে বাবা ও এসে বসলো….

বাবাকে দেখে জেবা বিস্মিত হলো,এসময় বাবা বাড়ি থাকেন না।।মাদ্রাসায় চলে যান,আর ফিরেন আবার সেই রাত ১০টা নাগাদ।
আশিকুর রহমান জেবাকে উদ্দেশ্য করে বললো “দেখ মা তুই বড় হয়েছিস, এখন তোকে সবকিছু বলে বুঝানো সম্ভব না, নিজ থেকে কিছু বিষয় বুঝে নিতে চেষ্টা কর, আর কখনো ঐদিকটায় যাবি না…. মনে রাখবি আর যেন বলতে না হয় ” বাবার গাম্ভীর্য দেখে জেবা ভয় পায়, আর আরো বেশি কৌতুহলী হয়ে উঠে….

কি আছে ওখানে? কেন যাবে না? জায়গাটা দেখতে কত সুন্দর আর নিরব, ছোটবেলা থেকেই নিরবতা জেবার খুব পছন্দের।।
বাবা চলে গেলে জেবা মাকে আবার প্রশ্নবিদ্ধ করে, “মা বলো না কেন??? কেন আমার প্রশ্নের উত্তর দাও না???

এবার জোবায়দার চোখে পানি চলে আসলো, জেবার কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল।
জেবা প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবে কেন এমন হচ্ছে?? মায়ের মুখের দিকে তাকালে জেবার খুব মায়া হয়, মা কখনো কিছু বলে না কিন্তু কষ্ট পেলে মুখ লুকিয়ে কান্না করে , ভাবতে ভাবতে জেবা আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

জেবা চোখ খুলে দেখতে পেল অপুর্ব দুটি চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে, জেবা নেশাগ্রস্থের মত সে চোখের দিকে তাকিয়ে আছে,, কারো চোখ এত সুন্দর হতে পারে, এত মোহনীয় হতে পারে জেবা চিন্তাও করতে পারছে না।।।মনে হচ্ছে এ চোখে পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসা লুকিয়ে আছে… আর জেবা সে চোখের মায়ায় বন্দি.

হঠাৎ জেবা বুঝলো কেউ একজন তাকে খুব জোরে জোরে ডাকছে…. (চলবে..)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.