অশুভ গলির তিন প্রেত­ [২য় অংশ]

ওয়াহেদ যদি এ দিকেই কোথাও দেড়-দুই কাঠার ওপর নিষ্কন্ঠক জমির খোজ দিতে পারে তো ভালো হয়। হাউজ বিল্ডিংয়ের লোন নিয়ে একটা বাড়ির কাজে হাত দেব। ফ্ল্যাটের এখন যা চড়া দাম। এদিকে নিজের একটা বাড়ির জন্য আমার বউ সঞ্চিতা বড় উতলা হয়ে উঠেছে।

সেই খালি রিকশাটা ওয়াহেদদের বাড়ির সামনে থেমে আছে। রিকশায় একটা মাঝবয়েসি লোক উঠল। মনে হল লোকটা ওয়াহেদদের বাড়ি থেকেই বেড়িয়ে এসেছ । কালো রঙের বেশ থলথলে শরীর। পরনে কালো প্যান্ট আর হলদে রঙের হাফ হাতা শার্ট। ফোলা ফোলা গোলগাল মুখে দাড়ি। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। লোকটাকে কেমন চেনা চেনা লাগল। সহসা চমকে উঠলাম-শাহনেওয়াজ! আশ্চর্য! শাহনেওয়াজ এখানে কেন! তাহলে কি ওয়াহেদ সুরভী কে বিয়ে করেছে। সেই সূত্রে শাহনেওয়াজ এ বাড়িতে আসে। আর ওদের মিটমাট হয়ে গেছে। কই, এসব কথা তো ওয়াহেদ আমাকে কিছু বলল না।

মাথার ভিতরে অনেক এলোমেলো প্রশ্ননিয়ে বারান্দায় উঠে এলাম। পুরনো আমলের রেলিং ঘেরা বারান্দার মেঝেটি লাল রঙের রেডঅক্সাইডের। এই বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে ওয়াহেদের বৃদ্ধ বাবা বসে থাকতেন।ধবধবে ফর্সা ছিল বৃদ্ধের গায়ের রং । খুব কাশতেন। সেই বারান্দা এখন শূন্য। বারান্দার লাল মেঝেতেসাদা অলপনা আঁকা। কার বিয়ের? শিউলির না ওয়াহেদ-এর? শিউলী এখন কোথায়? ওকে ভালো বেসেছিল আমাদের এক সহপাঠী আফসার। শিউলিকে নিয়ে গোপনে কবিতা লিখত আফছার। অবশ্য ওই পর্যন্তই। এটিও আমার ইউনিভারসিটি জীবনে দূর থেকে দেখাএকটি ঘটনা।

কলিংবেলে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটু পর যে মাঝবয়েসি মহিলাটি দরজা খুলে দিল তাকে দেখামাত্রই চিনতে পারলাম। সুরভী আমাকে দেখেও চিনতে পারল । বলল, এসো, এনামুল । ভিতরে এসো। কন্ঠস্বর কেমন শীতল।

আমি ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকেই কেমন একটা পুরনো গন্ধ পেলাম। ঘরের পরদা ফেলা। অল্প পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছিল। তবে ঘরটা আগের মতোই আছে দেখলাম। বেতের সোফার ওপর লাল মখমলের কাপড় বিছানো। সাদা চুনকাম করা দেয়ালে মাওলানা ভাসানীর একটা ফ্রেমবন্দি সাদাকালো ছবি। উলটো দিকে একটা ক্যালেন্ডার। ১৯৯৩ সাল দেখে চোখ আটকে গেল। কি ব্যাপার? এরা ক্যালেন্ডার বদলায়নি কেন? ঘরের বদ্ধ বাতাসে আগরবাতির মৃদু গন্ধ ভাসছিল।

বস। এনামুল। বলে সুরভী সোফার ওপর বসল। ওর পরনে ছাই ছাই রঙের একটা ছাপা শাড়ি। ক্লালো ব্লাউজ। এত বছর পর আর শরীরের সেই ছিপছিপে গড়ননেই। থাকার কথাও না। বেশ মুটিয়েছে সুরভী। শ্যামলা রংটা মলিন আর শুষ্ক মনে হল। তবে চশমা ছাড়া লাবণ্যহীন মুখটা কেমন অদ্ভূত দেখাচ্ছিল ওকে। মুখটা কেমন রক্তশূন্য ফ্যাকাশে বলে মনেহল।

কেমন আছ বল? সুরভী জিজ্ঞেস করে।

আছি। তোমরা?

আমরা? আমরা আছি একরকম।

একটু আগে আমি শাহনেওয়াজকে দেখলাম। সেই কথা আর বললাম না।বরং বললাম, এদিকে আসছিলাম একটা কাজে। হঠাৎ মনে হল ওয়াহেদের কথা।

ও।

তুমি কি চাকরি বাকরি কিছু করছ?

সুরভী মাথা নেড়ে বলল, আমি? না।

আমি কি করি বা কোথায় থাকি সুরভী সেসব জিজ্ঞেস করল না বলে খানিকটা অবাক হলাম।

হঠাৎ সুরভী বলল, আচ্ছা এনামুল তুমি একটু বস । আমি চা আর পাপড় ভাজা নিয়ে আসছি । বলে উঠে দাঁড়াল।ওদিকের দরজার কাছে যেতে না যেতেই সুরভী মিলিয়ে গেল। দরজার পর্দা দুলল না। আশ্চর্য তো। চোখের ভুল দেখলাম মনে হল। সমস্ত বাড়ি নিরব হয়ে আছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই।শব্দ যেন ঘনিয়ে ওঠা রহস্যময় তাকে ভেঙে চুরমার করে দেবে। এই ঘরের আলো কিছুটা ম্লান। আর বেশ ঠান্ডা ।

হঠাৎ দেখতে পেলাম নিঃশব্দে একটা বেড়াল এসে ঘরে ঢুকল। মেঝের ওপর বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কালো রঙের বেড়াল। চোখের মনি দুটি উজ্জ্বল হলুদ। বেড়ালটা একবারও ডাকল না। অচেনা মানুষ দেখে একবার অন্তত ডাকার কথা। অবশ্য আমি বেড়াল বিশেষজ্ঞ নই। তবে আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। ওয়াহেদ এখনও ফিরছে না কেন?

সোফার ওপর খবরের কাগজ পড়ে ছিল। তুলে নিলাম। দৈনিক ইত্তেফাফ। আজকাল এই পত্রিকাটা আগের মতন যত্রতত্র চোখে পড়ে না। পাতা উল্টে তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটি খবরে চোখ আটকে গেল। রামপুরার একটি বাড়িতে ভৌতিক কান্ড। রাতের বেলা কীসব যেন দেখা যায়। ভাড়াটে বেশি দিন থাকে না। বাড়িওয়ালা নাকি উলটো ভাড়াটেকে দুষছে …পড়তে পড়তে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসে ।

তুমি কেঠা বাবা?

খনখনে কন্ঠ শুনে আমি চমকে উঠলাম। মুখ তুলে দেখি আমার সামনে লাঠিতে ভর দিয়ে এক থুত্থুরে বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়েছে। বৃদ্ধ বেশ কুঁজো। চুল-দাড়ি- ভুরু সব পাকা। মাথায় কিস্তি টুপি।পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা রঙের লুঙ্গি। আশ্চর্য! কে ইনি? সুরভী কোথায় গেল?

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.